একটু অপেক্ষা...
IMG_20170409_154507-01

এলডিহাইড সি১২ এমএনএ

কুমকুত নামের একটা ফল আছে, ডিমের মতন সাইজ আর খেতে কমলার মতন ! ভেতরটা তিতকুটে কিন্তু বাইরের ছিলকাটা মিষ্টি, খাওয়া শুরু করলে ইচ্ছা হবে পুরোটাই খেয়ে ফেলি! তো, এর ছিলকা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিলো সে প্রায় দেড়শ বছর হবে। কুমকুতের ছিলকা থেকে একপ্রকারের তরল নির্যাস বের করে এনেছিলো তখনকার আতরচি-রা, যার নাম দেওয়া হয়েছিলো ” Kumquat Peel Essential Oil ” . এইটুকু হলেই হয়েছিলো, এর বছর বিশেক পরে কিছু রসায়নবিদের মাথায় কি খেললো কে জানে, তারা এটার ক্যামিকাল কম্পোজিশান বের করতে বসলো !

বিপুল পরিমাণে যেই যৌগটার উপস্থিতি টের পাওয়া গেছিলো ঐ অয়েলটায়, তার নাম ২-মিথাইল আনডেকান্যাল । আরো একভাবে বলা যায়, বারো কার্বনবিশিষ্ট ” মিথাইল ননাইল এসিটালডিহাইড “, সংক্ষেপে MNA । হালকা রসায়নের জ্ঞান থাকলেই বুঝতে পারবেন,উপরোক্ত ছবির গাঠনিক সংকেতে শেষের উঁচু মাথা হলো -CH_3 মিথাইল মূলক ; আর ননাইল এসিটালডিহাইড মানে CH_3(CH_2)_7CH_2- এর সাথে CH_3CHO এসিটালডিহাইডের আলফা হাইড্রোজেন এক্সচেইঞ্জে বানানো যৌগ । ১+৯+২ = ১২টা কার্বন এর হিসেব মিলে গেলো ! এইযে এমএনএ, তুমি কোন বংশের ছেলে? সুঘ্রাণজগতের “চৌধুরী” বংশ বলে খ্যাত এলডিহাইড এর ওয়ারিশ আমি !

ছিলকা থেকে ত্যাল বের করেছি, অইটার রাসায়নিক নাম কি সেটাও বের করা হলো। এবার ক্ষান্তি দাও? নাহ, “জানার কোনো শেষ নেই, জানার ইচ্ছা বৃথা তাই” সিস্টেমে এবার রসায়নবিদেরা উঠেপড়ে লাগলেন ঐ কুমকুতপিল থেকে না নিয়ে কিভাবে ল্যাবে বসে বসে তৈরি করা যায় এই যৌগ । নতুন কিছু টেকনিক এসেছে হাতে, চেষ্টা করেই দেখি ! [ ১১৩ বছর আগের কথা বলছি কিন্তু ] । এবং, এবারো তারা সফল হয়ে গেলেন, উচ্চতর কিটোন আর হ্যালোজেনোএসিড দিয়া বানায় ফেললেন MNA বাবুকে 😀 তাদের আনন্দ আর দেখে কে!!

বারো কার্বন তার তেলেসমাতি দেখানো শুরুও করেনি, ছয় কার্বনওয়ালা তরমুজ-এলডিহাইড আর চৌদ্দ কার্বনএর পিচ-এলডিহাইড মন জয় করতে লাগলো সবার। এভাবেই পারফিউমারি জগতে প্রবেশ করেছিলো এলডিহাইড ঘরানার র’ ম্যাটেরিয়ালগুলো । তাদের বলা হতো “সিজনিং” , খাবারে মশলাগুলো যেমন এক্সট্রা টেস’ নিয়ে আসে, ঠিক সেভাবেই এই এলডিহাইডগুলো পারফিউমে এক্সট্রা উচ্ছলতা আনতো ।
বাকিদের ভীড়ে এমএনএ হারায়েই যেত, যদিনা… যদিনা আর্নস্ট বিয়াউক্স নামের গুরুতর প্রতিভাধর রসায়নবিদ কাম আতরচি, এটার সুবাসে পাগলাটে হয়ে না উঠতেন ! ফরাসি রাজপরিবারের অফিসিয়াল সুঘ্রাণনির্মাতা ছিলো সে, প্রায় তিরিশ বছর ধরে পারফিউম ডিজাইন করতে করতে একসময় এলডিহাইডিক ঘ্রাণের [ বিশেষ করে এমএনএ এর] প্রেমে পড়ে যায় সে, বেশ কিছু এলকোহলিক সুবাস বানায়ে ফেলেন একে দিয়ে । ১৯২০ সালের দিকে সদ্যপরিচয় হওয়া বিজনেসউইম্যান মাদমোয়াজেল শ্যানেল এর ফরমায়েশে মোট ১০খানা স্যাম্পল বানায়ে দেন , আর সংখ্যা বিষয়ক কুসংস্কারে বিশ্বাসী শ্যানেল সেই স্যাম্পল থেকে ৫নাম্বারটা বেছে নিয়ে, তার নিজের নামের সাথে পছন্দের সংখ্যা ৫মিলায়ে ” শ্যানেল নাম্বার ৫” নাম দিয়ে ১৯২১ এর ০৫/০৫ তারিখে লউঞ্চ করে দিলো নিজস্ব ফ্যাশান বুটিকগুলোয়। এরপরে আর কি, ইতিহাস!

এর আগেও MNA দিয়ে বেশ কিছু পারফিউম বানানো হয়েছে [ ১৯০৫ সালে সবার আগে এটা দিয়ে “ফ্লোরাম্যে” পারফিউম বানায় পিভার কোম্পানি ] , কিন্তু মার্কেট পেয়েছিলো শ্যানেল৫ ই। হ্যা, ইউনিক মার্কেটিং আইডিয়া তো বটেই, এখানে গুরুত্ব পেয়েছিলো রেশিওটাও। এই যৌগটা এত তীব্র ঘ্রাণের, এত বেশি উৎকটভাবে প্রকাশ করে নিজেকে, কোনো আতরচি-ই তাদের বানানো সুঘ্রাণে একে ০.১% এর বেশি জায়গা দিতে চাননি [ মানে ১০০০মিলি পারফিউমে ১মিলি এমএমএ -_- ] । আর্নষ্ট সাহেব বুকের সব বল একত্রিত করে, পুরো ১% দিয়েছিলেন তার বানানো ব্লেন্ডটাতে, এরপর তীব্র পাওডারি-চুকা ঘ্রাণ ঢাকতে তৎকালীন সময়ের সবচে দামী উপাদান জেসমিন এসেনশিয়াল অয়েল দিয়েছিলেন আচ্ছা করে ; সাথে গোলাপ, ভ্যানিলা চন্দন আর ভেটিভার ঘাসের নির্যাস।
মজার বিষয় হলো, ইতিহাস বলে, এইখানে আসলে বুকের পাটার কিছু নেই। বিয়াউক্স সাহেবের সহকারী এমএনএ ডাইল্যুট করতে ভুলে গেছিলো, তাই ১০% কনসেন্ট্রেশন ভেবে তিনি যেটা দিয়েছিলেন তা আসলে ১০০% কনসেন্ট্রেশন ছিলো 😛 পরে ব্যাপারটা টের পেয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা আর কি। নাকি সত্যিই করেছিলেন এই এক্সপেরিমেন্ট? কে জানে!

শ্যানেল৫ কে ত্যাগ করে চলে আসি মূল প্রসংগে। এরপর গত ৯৭ বছর জুড়ে, এলডিহাইড সি১২ দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে বহু বহু এলকোহলিক বাসনা। ‘ছোট মুখ বড় কথা’র মতন করে, প্রায় প্রতিটা ঘ্রাণেই কম পরিমাণে থেকেও প্রভাব বিস্তার করেছে সে। এবার তাহলে বলেই ফেলি, শুধু এমএনএ এর ঘ্রাণ কিরকম!
সুঘ্রাণবোদ্ধাদের মতে, যখন এর কনসেন্ট্রেশন ১% মানে ১গ্রাম এমএনএ এর সাথে ৯৯গ্রাম ডিপিজি মিলায়ে একে পাতলা করা হবে, তখন এর আসল ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। এর ঘ্রাণে মিলে আছে চারটা জিনিস – ফ্রেশনেস, এম্বার, সাইট্রাস, মস । ফ্রেশনেস মানে সমুদ্রের উপরে দিয়ে বসে যাওয়া মৃদ্যমন্দ বাতাস, এম্বার মানে আম্বর পাথর থেকে যেই তীব্র ভেজামাটির মত ঘ্রাণ আসে সেরকম ; সাইট্রাস মানে তো বুঝেন ই, লেবুবর্গীয় ঘ্রাণ, আর মস মানে ভেজা অন্ধকার ফাকন্দপরা জায়গায় সবুজ কার্পেটের মতন মসের সোঁদা,ভোতা সবুজ ঘ্রাণ !

আমার কাছে কেমন লেগেছে?

IMG_20170409_161813-01

দেখতেই পারছেন ছবিতে MNA এর পাশে লেখা ডাইল্যুট। এটা ১.১২% ঘনমাত্রার, তার মানে সত্যিকারের ঘ্রাণের কানের পাশ দিয়ে গুলি চালায়ে দিছি 😀 শুরুতেই তীব্র ধাক্কা দিয়েছে ভোতা অথচ বায়বীয় একটা কিছু, অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে ধরতে পেরেছি যে, এটা O3 বা ওজোন নোট ! আজিব ব্যাপার, লেবুটাইপ ঘ্রাণ খুঁজেই পাওয়া যায়না ভারী একটা ঘ্রাণের কারণে, যেটাকে মসের চাইতে ঝুমবৃষ্টিতে মসজিদের নামাজের কার্পেট ভিজে গেলেও জায়গার অভাবে অগত্যা সেটাতেই নামাজ আদায়ের সময় সেজদায় গেলে যেই ভেজা, কার্পেটপচা ঘ্রাণ পাওয়া যায় — সেরকম লেগেছে ।
.
আচ্ছা, পারফিউমেন্সের কোন এলকোহলমুক্ত পারফিউমে এমএনএ আছে? আলবৎ আছে !  এক , দুই , তিন তিনটা পারফিউমে আছে ! নাক দিয়ে যট্টুক বুঝেছি, একটায় ১% এর কম কনসেন্ট্রেশন, একটায় ৩% এর উপরে, আরেকটায় তো ১০% এর কাছাকাছি :O
কি নাম তাদের? বলবো, বলবো ইনশাআল্লাহ 😀

Leave a Reply