একটু অপেক্ষা...
_20171129_194855-01

থিয়েরি মুগল্যের এ*ম্যান পিওর মল্ট | এলকোহলিক পারফিউম রিভিউ

আমি ইতিহাসের অতটা ভক্ত ছিলাম না কখনোই। ক্লাস ৯-১০ এ যখন সামাজিক বিজ্ঞানে প্রশ্ন আসত অধ্যায়৩ এ থাকা আগেকার দিনে ঘটে যাওয়া কাহিনীগুলোর ব্যাপারে,স্রেফ বানায়ে লিখে দিতাম ঐ অংশটুকু। আরেহ, সৃজনশীল হতে বলেছে, দুদ্দার লিখে যাও!

যখন ফাইন-ফ্রেগরেন্স জগতটায় পা দিলাম,দেখি কি,এখানে দুইজাতের বোদ্ধা আর তিনরকমের যোদ্ধা আছে। বোদ্ধা যারা, তাদের মধ্যকার কিছু মানুষ ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয় অনেক বেশি। তারা কেবলমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর পারফিউমের অন্ধভক্ত, যাদের রেপুটেশান অনেক হাই, যারা বহুবছর ধরে এই সেক্টরে ছড়ি ঘুরায়ে চলেছেন।
আর অন্য বোদ্ধারা অতীতকে গুরুত্ব দেয়না অতটা, মোটামুটি নতুন কোন প্রতিষ্ঠান-ও যদি চমক দেখানো কোন পারফিউম বানায়ে ফেলে তাহলে তারা সেটাকে সাধুবাদ ও কাবার্ডবাদ জানান।
… যোদ্ধা মানে, যাদের বানানো পারফিউম আমরা গায়ে আর কাপড়ে ছিটাচ্ছি।
(১) প্রথম পদের হচ্ছে বিগশট, অধিকাংশ সময়েই যার নামে প্রতিষ্ঠান, সে পারফিউমের ব্যাপারে এক্সপার্ট থাকেননা অতটা। নিজের ব্র‍্যান্ডভ্যালুকে কাজে লাগিয়ে বিশেষজ্ঞ পারফিউমারদের বানানো সুঘ্রাণকে তারা মার্কেটিং করেন চটকদার প্যাকেজিং সহকারে। উদাহরণ হিসেবে অবশ্যই আসবে শ্যানেলের নাম!
(২) প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে আছে ডিজাইনার পারফিউম বানানো প্রতিষ্ঠানগুলো, তফাৎ হচ্ছে এখানে কাজ করা হয় এজ এ টিম এবং কাজ করা হয় গণমানুষের জন্য। এরা এমন সব সুঘ্রাণ বানায় যেগুলো যেকোন ধরণের মানুষকে মুগ্ধ করবে, করতে বাধ্য। রিক্সবিহীন কাজকম্ম আর কি।
কেলভিন ক্লেইন,গুচ্চি, জা পল গলটিয়ার, জিভঞ্চি, বুলগেরি, ভার্সাচে — আরো কত নাম এই লিস্টে!
(৩) নিশ পারফিউম বানানো গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান। এদেরকে বলা যায় “সুঘ্রাণজগতের এপল”। তারা খুবই সিলেক্টেড মানুষদের কথা ভেবে খুবই কম পরিমাণে আকাশচুম্বী দামের কিছু সুঘ্রাণ বানায়। এমন সব ঘ্রাণ, ঠিক সেইমনস্ক না হলে যেটার মর্ম আপনার দ্বারা বুঝা সম্ভব না, আপনার নাক দ্বারা যেটা সহ্য করাও সম্ভবপর না!
আমি নিশ পারফিউম বানানো প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরি ক্রিদ,এমুয়াজ,টমফোর্ড,জার্জফ,রোজা পারফিউমারি এদেরকে। মাত্থানষ্ট করা একেকটা ঘ্রাণ ^_^

যোদ্ধা হতে দেরি আছে অনেক। আগে এই জগতটাকে চিনে নিই ভালো করে — সেই লক্ষ্যে আগাচ্ছিলাম আর হোঁচট খাচ্ছিলাম খুব। ঠিক সে মুহূর্তে এক ডাক্তার সাব হাত ধরলেন কষে,এরপরে সাধ আর সাধ্যের মাঝখানের যেই পথ সেটা পার করায়ে দিলেন অন্নেক স্মুদলি! গত একবছরে ২০০ রকমের-ও বেশি এলকোহলিক সুবাসকে আত্মস্থ করার সুযোগ হয়েছে, নাক প্রতিনিয়ত চমকাচ্ছে আর নিজেকে গুছায়ে নিচ্ছে আরো ভালো কিছুর জন্যে।

আজ যেই এলকোহলিক সুবাস নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছিলাম,সেটার প্রতিষ্ঠানকে প্রথম পদের যোদ্ধার কাতারে ফেলতেই চাবো আমি। থিয়েরি মুগল্যের সুঘ্রাণজগতের কেউ না বলেই মূলত! ফ্রেঞ্চ ফ্যাশন ডিজাইনার,ফডুগ্রাফার কাম ডান্সার এই লোকটাকে ঠাট্টা করে ‘পুরুষ শ্যানেল’ উপাধি দিয়েছিলাম…! আগেই বলেছি ইতিহাস আমার দুইচোখের বিষ, তাই আর না দোহরাই। কাজের কথায় আসি, A*Men এর ব্যাপারে আওড়াই কিছু।
খুব খুব পছন্দের একটা ঘ্রাণ এটা। ভারী, মিষ্টি, একটু প্রকৃতির ছোঁয়া, খানিকপরে আবার ক্যারেমেলের টাচ– মোটকথা শীতকালের সাথে মানানসই একটা সুবাস।
A*Men এর বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাংকার ( মূল ঘ্রাণের সাথে হালকা মিলসম্পন্ন / একই পরিবারের সদস্য) বের করেছিলো মুগল্যের সাহেব, সেগুলোর মধ্যে Pure Havanne, Pure Wood আর Pure Malt রয়েছে কালেকশানে। পিওর উড-টা মনে জায়গা করতে পারেনাই অতটা, কিন্তু বাকিদুইজন?? পিওর জিনিস দাদা, পিওর জিন্নিস!

মল্ট কি জিনিস, কিভাবে হয়, জানতাম না আগে। থার্ড ইয়ারে ন্যাচারাল প্রডাক্টসের উপরে ২ক্রেডিটের কোর্স আছে একটা, তখন ব্যাপারটা নজরে আসলো। কাঠখোট্টা ক্যামিস্টদের কাছে মল্টিং মানে হচ্ছে শস্যে থাকা কার্বোহাইড্রেটকে ভেঙে সহজতর সুগার (এক্ষেত্রে মনোস্যাকারাইড) বানানো। সবচাইতে পপুলার মল্টিংকে যদি বিবেচনা করি, মানে মল্ট বার্লির কথা, সেইখানে বার্লিতে থাকা স্টার্চকে এনজাইমের প্রভাবে ভেঙে সহজতর শ্যুগার [ দুই গ্লুকোজ ইউনিটযুক্ত মল্টোজ, তিন গ্লুকোজ ইউনিটযুক্ত মল্টোট্রায়োজ আর এমাইলোপেক্টিন যেটা পরে আবার গ্লুকোজে পরিণত হয় ] বানানো হয়:

Malt-breaking-of-starch

এরপরে সেই মল্টেড বার্লিকে ফুটায়ে ঠান্ডা করে ইস্টজাতীয় উপাদান দিয়ে গাঁজিয়ে আস্তেধীরে প্রস্তুত করা হয় বিয়ার -_-

মদ পান করা ইসলামিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে, পুরোপুরি হারাম। আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালার পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা পাওয়া যায় সূরা মায়েদার ৯০-৯১ আয়াতে, সূরা নিসা’র ৪৩ নাম্বার আয়াতে, সূরা বাকারার ২১৯ নাম্বার আয়াতে। ” যা নেশা সৃষ্টি করে তাই মদ, আর যা নেশা সৃষ্টি করে তাই হারাম”, ” কোন মদ পানকারী মদ পান করার সময় ঈমানদার থাকেনা”, “যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে মদ পান করতে পারে না”— প্রতিটাই সহীহ হাদিস, পেয়ারে রাসূল(সা) এর জবান-নি:সৃত সতর্কবাণী।

জানা নেই বিয়ারের স্বাদ-গন্ধ কেমন, জানার কোনপ্রকারের কোন আগ্রহ ও নেই। তবে Theirry Mugler A*Men Pure Malt এর ঘ্রাণ নেওয়ার সময়েই মনে হয়েছে, কিছু একটা ঘাপলা আছে এখানে!! কেমন একটা দমবন্ধকরা ঘ্রাণ শুরুতেই, যেন বিশাল একটা কোল্ড স্টোরেজে নানান জাতের ফল রাখা, এরপরে হঠাৎ পুরো ৪৮ ঘণ্টা কারেন্ট না থাকায় ফলগুলা পচতে শুরু করেছে — ঐ মুহূর্তের অনুভূতি যেন!
এমন লাগে স্প্রে করার প্রথম ৩০ মিনিট। আস্তে আস্তে রূপ বদলায় Pure Malt. সে তার ব্যুজি নোটকে একটু সরায়ে ভ্যানিলা আর এলপেনলিভে ধরণের ক্যারামেল চকলেটি ভাব ধরে, ঠিক যেখানটায় আমি মিল খুঁজে পাই Jean Paul Gaultier এর Ultra Male এর সাথে।
এই মিডলনোট আমি পেয়েছি শরীরে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার মতন। আল্টিমেট ড্রাইডাউনে সেই ফলপচা ঘ্রাণ ফিরে আসে আবারো, ভ্যানিলা রয়ে যায় — মোটকথা A*Men এর ফ্ল্যাংকার হিসেবে পিওর মল্টের সার্থকতা তার বেইজনোটেই, আসলটা থেকে প্রকৃতির ছোঁয়া মাইনাস আর পচাভাব প্লাস, এইতো তফাৎ লাগে শেষে এসে।

পিওর মল্ট অবশ্যই শীতকালীন ঘ্রাণ, এটার সিলিএজ অতটা আহামরি লাগেনি কেন যেনো। প্রজেকশান বাবলের রেডিয়াস সাড়েতিনহাতের মতন। আশেপাশের মানুষ ফ্রুটিনেস টের পাবে নি:সন্দেহে, “দাদা ‘খেয়ে’ এসেচেন নাকি” টাইপ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবেনা আশা করি…!

Leave a Reply