একটু অপেক্ষা...
english-thyme-01

থাইম এসেনসিয়াল অয়েল — এক্সপোজড !

শুরুতেই অঘটন ! থাইম এসেনশিয়াল অয়েলের ঘ্রাণ সুপারির সাথে মিলে নাকি পচা গামারি কাঠের মতন –  কনফিউশানে পড়ে গেছিলাম । এমন অবস্থায় মন আঁকুপাঁকু করে খুব, উত্তর জানার জন্যে । তাই, যা হবার তাই, তাড়াহুড়ায় সব ধরণের সতর্কতা ভুলে , খালি হাতেই খুলেছিলাম আলো-বাতাস যেনো ঢুকতে না পারে সেভাবে টাইট প্যাকড করা খয়েরি কাচের বোতলটার মুখ। কিভাবে যেনো হাতের পেছনের দিকটায় লেগে গেলো এই অল্পএকটু র’ থাইম অয়েল! আর যায় কোথায়, মুহূর্তেই তীব্র জ্বলুনি, চামড়া লাল হয়ে ফুলে গেলো বেশ খানিকটা -_- সাথেসাথে অনেক পানির ঝাপটা, বার কয়েক ক্ষারীয় পদার্থ দিয়ে হাত ধুয়ে অয়েলটার মূল উপাদান Thymol দূর করার চেষ্টা… আধঘন্টা পরে স্ট্যাবল হতে পারলাম আর কি ! জ্বি, আজকের আলোচ্য এসেনশিয়াল অয়েলটা অনেক বেশি ভয়ংকর, আবার অনেক বেশি উপকারীও ! আমরা আলোচনা করবো এর ক্যামিকাল কম্পোজিশন নিয়ে, এটি কিভাবে এবং কেন এত ভয়াবহ, তবুও কেন এই অয়েলটার এত নাম-ডাক চারিদিকে — সব, সব!

থাইম আমাদের দেশে অতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি এখনো। আমরা যেমন ঝোলের তরকারীতে একটু ভিন্নতা আনার জন্যে জিরার গুড়া ছিটায়ে দেই উপর দিয়ে , লেমনেডের স্বাদ বাড়াতে পুদিনাপাতা ব্যবহার করি, ইতালিয়ান ক্যুসিনে ” ত্যি-মো ” বা থাইম পাতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে তার চাইতেও অনেক বেশি পরিমাণে, ফরাসি রান্নাগুলোতেও তাই । হালের ক্রেজ বিভিন্ন ধরণের স্টেক গ্রিল করার সময় মাংসের ফাঁকেফাঁকে থাইম/রোজমেরি/সেইজ পাতা গুজে দিলে ঘ্রাণে অর্ধভোজনং না, পুরো মহাভোজনং হয়ে যায়! ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোর ইতালিয়ান রেস্তোরাগুলোতে ঢুকে খাটি ঐদেশি পিজ্জার অর্ডার দিলে টপিং এ থাইমের ছড়াছড়ি চোখে পড়ার মত *_*

থাইমের খাবারের স্বাদবৃদ্ধিকারক গুণের কথা ত বটেই, এর ঔষুধী গুণের কথা মানুষ জানে প্রায় ৩০০০ বছর ধরে ! গ্রিক আর রোমান-রা তাদের গোসলের গরম পানিতে টাটকা থাইম পাতা ছিড়ে দিতো, কল্পনার চোখে এই তো দেখা যায় ভারী কাঠ কাঠ আবার সবুভাজ একটা সুখানুভূতি আচ্ছন্ন করে রেখেছে তাদের ! কাষ্ঠল ঘ্রাণ যেহেতু, তারা করত কি , এর ডালপালা পুড়াতো ঘরের মাঝে, সেই গাছপোড়া ধুয়া তাদের বড্ড পছন্দ ছিলো ! আরেকটা কাজ করতো তারা, থাইম গাছের উপরের দুই বা তিনটা পাতা ছিড়ে [ দেখলেন, চাপাতার সাথে মিল আছে! ] , পানিতে বহুদিন জ্বাল দিয়ে বাষ্পটাকে ঠান্ডা করে বের করতো Thyme Essential Oil, তারা বিশ্বাস করত যে এই পাতানি:সৃত তেলটা শরীরকে পবিত্র করে, শ্বাস-প্রশ্বাস আরো সুন্দর করে নেওয়া যায়, শরীরকে শক্তসামর্থ্য করে।
এই এতো বছর পরে কতশত প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবার পরেও প্রায় কাছাকাছি পদ্ধতিতেই থাইম এসেন্সিয়াল অয়েল বের করা হয়, আর কি আশ্চর্য, এতো বছর আগেকার চিন্তাগুলোর সাথে আধুনিক রসায়নিক চিন্তাধারা অনেকটাই মিলে যায় 😀

বুঝতেই পারছেন, আগামী দুইটা প্যারা-তে মাথার কয়েকহাত উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার ম্যাটেরিয়াল থাকবে নন-ক্যামিস্ট্রিয়ানদের জন্যে। আমরা এখন জানার চেষ্টা করবো এমন উদ্ভট ঘ্রাণের আর হাত-জ্বলানো ব্যাপারের পেছনে কে দায়ী ! থাইমপাতা থেকে স্টিম ডিস্টিলেশান করে যেই অয়েলটা পাওয়া যায়, সেটা খুবখুবখুব ই ডেন্স বা ঘন। বলা চলে, ১০০ গ্রাম থাইম পাতা থেকে খুব বেশি হলে দেড়গ্রামের মতন এসেনশিয়াল অয়েল পাবো । এই থাইম অয়েলকে NMR স্পেক্ট্রোস্কোপি বিশ্লেষণ করে  প্রায় ৭৪% এর মতন Thymol, ৭% এর মতন Carvacrol, ৫% এর কাছাকাছি Para-Cymene পাওয়া যায় [ উৎপাদনের এলাকাভেদে ভিন্ন হয় উপাদান ] । মজার বিষয় হলো, এদের তিনজন আত্মীয় একে অপরের, প্যারা-সায়মিনউদ্ভূত যৌগ হলো থাইমোল ; থাইমোল আবার কার্ভাক্রল এর আইসোমার (কারভাক্রল এ -OH গ্রুপ অর্থো পজিশানে, থাইমোল এ প্যারা পজিশনে) । তার মানে বুঝা যাচ্ছে, ঘুরেফিরে থাইমোল-কে দায়ী করা যেতেই পারে!

থাইমোল, এরোমেটিক মনো-টারপিনয়েড । এতে বেনজিন রিং কেবল একটা রয়েছে, দুই নাম্বার কার্বনে দুইটা -CH_3 আছে, পাঁচ নাম্বারে আছে আরেকটা। এখানে মূল কালপ্রিট বলা চলে একনাম্বারে লেগে থাকা -OH কে, যা এই যৌগকে ফেনলিক স্ট্রাকচারে পরিণত করে । এর বিধ্বংসী রূপ দেখা যায় ব্যাকটেরিয়া আর ফাংগাসের কিছু স্ট্রেইন-কে সামনে পায় যদি ! কোষীয় গ্লুকোজ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ আর, ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি একদম কমায়ে যেমন দেয় এই যৌগ ; ঠিক সেভাবে ফাংগাসের কোষঝিল্লির উপরে উড়ে গিয়ে জুড়ে বসে সেটাকে বিচ্ছিরিভাবে উলোট-পালোট করে ফাংগাসকে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে দেয় 😀

IMG_20170421_200919-01

থাইমোল+এর জ্ঞাতিভাই কার্ভাক্রল উপাদানদ্বয় থাকায় থাইম এসেনশিয়াল অয়েল এভাবে হয়ে উঠে এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল, এন্টি-ফাংগাল, চরম একটা এন্টি-সেপ্টিক ! এছাড়া অন্য কোন গুণ? ইন্টারে মানবদেহের গঠন পড়ার সময় দেখেছিলাম ফুসফুসের সাথে ফ্যারিংস আর ল্যারিংস কে যুক্ত করে ট্রাকিয়া । থাইম অয়েলযুক্ত বাতাস টেনে নিলে বলে সেই বিটারিসেপ্টর-ওয়ালা ট্রাকিয়া অনেকখানি রিলাক্স ফিল করে!!! যা ব্বাবাহ, ঐ ৩০০০ বছর আগে চিন্তা করা ব্যাপারগুলো দেখি সব মিলে গেলো :/ ব্যাকটেরিয়া ফাংগাস সেপ্টিক সব দূর করে শরীরকে যেমন পবিত্র করে, আবার শ্বাসপ্রশ্বাসে টান-টান উত্তেজনা ছাড়ায়ে নিয়ে আসে প্রশান্তি 🙂

ঐ লোকগুলো অবশ্য থাইম অয়েলের আরো কিছু গুণ আবিষ্কার করতে পারেনি । আরথ্রাইটিস আর গাউটে এর ব্যবহার আরাম আনে অনেকাংশে, চুলপড়া রোধে এর কিছু উপাদান কাজ করে, দুর্গন্ধ আর ব্যাকটেরিয়া দূর করতে মাউথওয়াশ এ ব্যবহার করা যায় এবং ব্যবহার হচ্ছে , ইয়াং জেনারেশনের কমন রোগ হিসাবে খ্যাত রাতজাগা বা ইনসমনিয়াকে কমে আসে বুকে থাইম অয়েল মালিশ করলে…

হায় হায়, ভুলে হাতে একটু লেগে যাওয়ায় যে হাল, মাথায় আর বুকে দিলে বেঁচে থাকার সব আশা তো ছাড়তে হবে দেখছি ! জ্বি, র’ বা আন-কাট থাইম অয়েল ইউজ করলে এমন কিছুই হতে পারে। থাইম অয়েল অন্য এসেনশিয়াল অয়েলের চাইতে প্রায় ৫গুণ বেশি শক্তিশালী আর বিধ্বংসী, তাই ডার্মাটোলজিস্ট এবং ক্যামিস্টগণ এর মতে, কোনোমতেই প্রয়োগের সময় এর মাত্রা যেনো ১% এর চাইতে বেশি না হয় ! এর মানে, আপনি এপ্লাই করতে চাইলে ৯৯ গ্রাম ক্যারিয়ার অয়েল [ সিসেইম / এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ / ক্যাস্টর / সানফ্লাওয়ার ] এ মাত্র ১গ্রাম থাইম দিবেন, এনাফ ! কি ভাবছেন, এক পারসেন্টে তো কিছুই বুঝতে পারবোনা এর রূপ-গন্ধ, তাই না? টপ সিক্রেট একটা তথ্য দেই, বলিয়েন না কাউকে । আমাদের Shine & Silky বিয়ারড অয়েলে এন্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণ দেওয়ার জন্য প্রতি এক লিটারে ০.৬৭৭ গ্রাম [ জ্বি, ১০০০ মিলিতে ০.৬৭৭ গ্রাম ] থাইম অয়েল দিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন, বাকি এসেনশিয়াল অয়েলগুলো দেওয়া হয়েছে এর চাইতে প্রায় চল্লিশ গুণ বেশি , তবুও এখন শাইন এন্ড সিল্কি থেকে যেই চরম ম্যানলি কাঠুরে টাইপ স্মেল আসে, পুরোটার জন্যেই দায়ী থাইম এসেনশিয়াল অয়েল 🙂 একলাই সবকিছু সাবাড় করার জন্য কত উদগ্রীব এটা, দেখলেন?

বাংলাদেশে এসেনশিয়াল অয়েল এবং এর ব্যবহার জনপ্রিয় করার জন্য পারফিউমেন্স জোট বেধেছে অরগানিক ফ্যাক্টরি’র সাথে 🙂
নিজস্বভাবে আমদানি ও পরীক্ষা করা বেশ কিছু ধরণের এসেনশিয়াল অয়েল জনসাধারণের মাঝে পরিচিত করানোর ইচ্ছা আমাদের। সেই উদ্যোগের শুরুয়াদ Thyme Essential Oil দিয়েই হোক 🙂 আমরা ১২মিলি ও ৬০ মিলি — এই দুইটি সাইজের বোতলে বিক্রয় করবো এসেনশিয়াল অয়েল, ইনশাআল্লাহ ।
কোনো এসেনশিয়াল অয়েল “সেইফ ইউসেজ” ঘনমাত্রা যতটুকু সর্বোচ্চ, আমরা সেই পরিমাণে আন-কাট অয়েল ডিজলভ করে দেবো নিজস্বভাবে এক্সট্রাক্টেড সিসেইম অয়েল এ 🙂 তার মানে হাতে পাওয়ামাত্র ব্যবহার শুরু করতে পারবেন আপনি, জ্বলুনি বা লালচে ভাবের বালাই থাকবে না একটুও।

যেহেতু নতুন উদ্যোগ, তাই আগামী কিছুদিন এসেনশিয়াল অয়েল-টি কিনতে পারবেন ২০% ছাড়ে , এখান থেকে

One thought on “থাইম এসেনসিয়াল অয়েল — এক্সপোজড !

Leave a Reply